-

বাংলা এনকোডিংয়ের দ্বৈরথ: ইউনিকোড বনাম বিজয় এবং আধুনিক সমাধান

বাংলা ভাষাকে ডিজিটাল জগতে সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াইটি দীর্ঘদিনের। এই যুদ্ধের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি শক্তিশালী শিবির—একদিকে আধুনিক ও সার্বজনীন ইউনিকোড, অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী ও শক্তিশালী বিজয়

ব্যক্তিগতভাবে আমি যখন প্রথম গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ শুরু করি, তখন একটি বড় সমস্যায় পড়েছিলাম। ক্লায়েন্টের জন্য চমৎকার একটি রিপোর্ট ইউনিকোডে লিখে ফেললাম, কিন্তু সেটি যখন অফসেট প্রেসের পুরনো কোরেলড্র (CorelDraw) সফটওয়্যারে ওপেন করা হলো, তখন দেখি সব অক্ষর ভেঙে অদ্ভুত চিহ্নে পরিণত হয়েছে! সেই মুহূর্তে বুঝেছিলাম, ডিজিটাল যুগে টিকে থাকতে হলে ইউনিকোড এবং বিজয়—উভয় ব্যবস্থার মধ্যে একটি নিখুঁত সমন্বয় কতটা জরুরি।

এই সমস্যার মূলে রয়েছে এনকোডিংয়ের এক গভীর দ্বন্দ্ব। বর্তমান সময়ে এই জটিলতা নিরসনে সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো একটি সঠিক রূপান্তরকারী টুল। বিশেষ করে যারা প্রফেশনাল গ্রাফিক ডিজাইন বা প্রিন্টিংয়ের কাজ করেন, তাদের জন্য একটি বিশ্বস্ত ইউনিকোড টু বিজয় বাংলা কনভার্টার ব্যবহার করা এখন সময়ের দাবি। এটি আপনার ইউনিকোডে লেখা টেক্সটকে নির্ভুলভাবে বিজয়ে রূপান্তর করে ডিজাইনের উপযোগী করে তোলে, যা কাজের গতি এবং নির্ভুলতা উভয়ই নিশ্চিত করে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: বিজয়ের উত্থান ও ইউনিকোডের আগমন

১৯৮০-র দশকের শেষভাগে যখন বাংলাদেশে প্রথম বাংলা কম্পিউটিংয়ের সূচনা হয়, তখন আন্তর্জাতিক কোনো স্ট্যান্ডার্ড ছিল না। সেই শূন্যতা পূরণ করে মোস্তফা জব্বারের উদ্ভাবিত বিজয়। এটি ASCII কোডের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি সিস্টেম, যা পুরো একটি প্রজন্মকে কম্পিউটারে বাংলা লেখার সুযোগ দিয়েছিল।

পরবর্তীতে আসে ইউনিকোড—বিশ্বের সমস্ত ভাষাকে একটি একক আইডেন্টিফায়ারের আওতায় আনার মহাপরিকল্পনা। বাংলা ইউনিকোড আসার ফলে আমরা আজ ইন্টারনেটে, সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং মোবাইলে সহজেই বাংলা লিখতে পারছি। কিন্তু সমস্যা বাঁধে তখন, যখন এই আধুনিক ইউনিকোড ডাটা পুরনো বিজয়-নির্ভর গ্রাফিক সফটওয়্যারের (যেমন: Adobe Illustrator, Photoshop বা QuarkXPress) মুখোমুখি হয়।

কেন এই সংঘাত? ফন্ট বনাম অক্ষর

  • বিজয় (Font-based): এখানে প্রতিটি অক্ষর ফন্টের একটি নির্দিষ্ট গ্লিফ বা পজিশনে থাকে। এটি মূলত টাইপসেটিং এবং প্রিন্টিংয়ের জন্য এখনো অত্যন্ত জনপ্রিয়।
  • ইউনিকোড (Character-based): এখানে “ক” একটি নির্দিষ্ট বৈশ্বিক কোড, যা যেকোনো আধুনিক ডিভাইসে বা ওয়েব ব্রাউজারে একই দেখাবে। এটি ইন্টারনেট ও ডাটাবেজের জন্য আদর্শ।

যখন আপনি একটি ওয়েব কন্টেন্ট (ইউনিকোড) প্রিন্টিং প্রেসে পাঠান, সেখানে পুরনো সফটওয়্যারগুলো ইউনিকোড চিনতে না পেরে অর্থহীন প্রতীকে রূপান্তর করে। ঠিক এখানেই একজন দোভাষীর মতো কাজ করে ইউনিকোড টু বিজয় কনভার্টার।

সমাধানের সেতুবন্ধন: রূপান্তরের সেরা কৌশল

একটি আদর্শ কনভার্টার শুধু কোড পরিবর্তন করে না, বরং বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও যুক্তাক্ষরের গঠনও বজায় রাখে। সঠিকভাবে রূপান্তরের জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা বুদ্ধিমানের কাজ:

  1. শুরুটা হোক ইউনিকোডে: যেকোনো খসড়া বা অনলাইন কন্টেন্ট ইউনিকোডে (Avro বা UniJoy) লিখুন। এটি আপনার লেখাকে ভবিষ্যৎ-সুরক্ষিত রাখবে।
  2. প্রয়োজনে রূপান্তর: যখন নির্দিষ্ট কোনো প্রিন্টিং বা ডিজাইন সফটওয়্যারে কাজ করবেন, তখনই কেবল একটি অনলাইন কনভার্টার ব্যবহার করে সেটিকে বিজয়ে রূপান্তর করুন।
  3. ফন্ট নির্বাচন: রূপান্তরের পর কাঙ্ক্ষিত বিজয় ফন্ট (যেমন: SutonnyMJ বা সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো ফন্ট) সিলেক্ট করতে ভুলবেন না।
  4. যাচাইকরণ: রূপান্তরের পর যুক্তাক্ষর, কার-চিহ্ন এবং বিরাম চিহ্নগুলো একবার চেক করে নেওয়া নিরাপদ।

ভবিষ্যতের বাংলা কম্পিউটিং

প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে এই বিভাজন হয়তো কমে আসবে, কারণ আধুনিক সফটওয়্যারগুলো এখন ইউনিকোড সাপোর্ট বাড়াচ্ছে। তবে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প ও সরকারি নথিপত্রে বিজয়ের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে আরও বহু বছর এই কনভার্টারগুলোর প্রয়োজনীয়তা থাকবে।

উপসংহার: ইউনিকোড আমাদের গ্লোবাল কানেক্টিভিটি দিচ্ছে, আর বিজয় আমাদের প্রকাশনা শিল্পকে সমৃদ্ধ করছে। এই দুইয়ের মধ্যে সেতু বন্ধন হিসেবে ডিজিটাল কনভার্টার টুলগুলো বাংলা ভাষার ডিজিটাল অস্তিত্বকে আরও গতিশীল করছে। প্রযুক্তি আসে এবং যায়, কিন্তু সঠিক সরঞ্জামের ব্যবহার আমাদের ভাষাকে প্রতিটি মাধ্যমে মর্যাদার সাথে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

সর্বশেষ প্রকাশিত